Creating  healthier  tomorrow

Blogs

বায়ু দূষণ কেড়ে নিচ্ছে লাখো মানুষের প্রাণ

Published by Lutfun Nahar Mukta    Feb-24-2018

Blog Image

খাবার, পানি আর বাযু ছাড়া জীবজগতের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। যদিও খাবার বা পানি ছাড়া আমরা বেশ কিছুদিন বেঁচে থাকতে পারি। কিন্তু বায়ু ছাড়া দিন, ঘণ্টা দূরে থাক; আমরা সর্বোচ্চ তিন মিনিট পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারি। ফলে নির্মল বাযুসেবন প্রতিমুহূর্তের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। অথচ আমাদের চারপাশের পরিবেশের এই বিপর্যয়ের একটি অন্নতম কারন হচ্ছে বায়ু দূষণ। যার ভয়াবহতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। প্রভাবশালী চিকিৎসা জার্নাল ল্যানসেট জুন,২০১৬ সালের একটি প্রতিবেদেন বলেছে, বাংলাদেশে ২২ শতাংশ মানুষ বাতাসে ভাসমান বস্তুকণা ও ৩০ শতাংশ মানুষ জ্বালানি-সংশ্লিষ্ট দূষণের শিকার। যা একটি ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন করতে যাচ্ছে ।


বিশ্ব পরিবেশের যেমন দ্রুত অবনতি হচ্ছে, তেমনি বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে এ অবনতি হয়েছে আরও দ্রুত। বাংলাদেশে ১৯৯৫ সালে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন পাশ হয়েছে। কিন্তু জনবিস্ফোরণ, বনাঞ্চলের অবক্ষয় ও ঘাটতি এবং শিল্প ও পরিবহণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অভাবের দরুন দেশের পরিবেশ এক জটিল অবস্থার দিকে পৌঁছতে যাচ্ছে। বিগত বছর ১৫ ফেব্রুয়ারি বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি-২০১৭ নামক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বায়ুদূষণের ক্রমমাত্রায় আমাদের ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয়। প্রথম অবস্থানে আছে দিল্লী। এ প্রতিবেদন বলছে গত ২৫ বছরে (১৯৯০-২০১৫) বায়ুদূষণ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ভারত ও বাংলাদেশে যদিও চীন এ তালিকায় আগে প্রথম অবস্থানে ছিলো।


আমাদের দেশ বায়ুদূষণের বড় কারণ হচ্ছে, যাচ্ছেতাইভাবে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা। কলকারখানার কালো ধোওয়া. নগরায়নের কাজ সময়মতো শেষ না হওয়া এবং যথেষ্ট সতর্কমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করে এমন উন্নয়ন কাজ পরিচালনার কারণে বাতাস ভয়াবহভাবে দূষিত হচ্ছে. ইউরোপীয় পরিবেশ সংস্থা জানিয়েছে বিদ্যুত উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার এবং শিল্প কারখানা ও গাড়ি থেকে নির্গত ধোঁয়া বায়ু দূষণের প্রধান কারণ।


বাংলাদেশে বায়ু, পানি ও পরিবেশ দূষণে বছরে ক্ষতির পরিমাণ ৪২ হাজার কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২.৭ ভাগ৷ শুধুমাত্র বায়ু দূষণে ক্ষতি হয় ২০ হাজার কোটি টাকা৷ দূষণের সবচেয়ে বেশি শিকার হয় বৃদ্ধ এবং শিশুরা৷


প্রথম আলো থেকে পাওয়া তথ্য মতে, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট এবং ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভালুয়েশনের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে রাজধানী ঢাকার বাতাসে সবচেয়ে ক্ষতিকর পদার্থ পি এম ২.৫ এর মাত্রা মারাত্মক ভাবে বেড়ে চলেছে ।প্রতিবেদনে বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে বছরে ১ লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে বলে বলা হয়েছে। আর বায়ুদূষণের কারণে শিশুমৃত্যুর হারের দিক থেকে পাকিস্তানের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান।


পিএম ২.৫ হচ্ছে এমন এক ধরনের কঠিন বা জলীয় অতি সূক্ষকণা যা আড়াই মাইক্রোন বা তার নিচে চওড়া। মনে রাখা দরকার যে, এক ইঞ্চি সমান ২৫০০০ মাইক্রোন। যদি উদাহরণ হিসেবে বলি তাহলে বলা যায়, এ কণা একটা চুল যতটা চওড়া তার ত্রিশ ভাগের এক ভাগ সমপরিমান চওড়া। ফলে এটা এমন সূক্ষকণা যা খালি চোখে দেখা যায় না। এর সূক্ষতা এতই যে খুব সহজেই প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসের গভীরে পৌঁছে যায়। সেখান থেকে হার্ট হয়ে রক্তের মাধ্যমে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। যা শ্বাসতন্ত্রের নানাবিধ রোগ যেমন হাঁচি, কাশি, শ্বাসকষ্ট, নাক দিয়ে পানি পড়া থেকে শুরু করে এমন ছোটখাট অসুখ, ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিসসহ হার্ট অ্যাটাক এবং ক্যান্সারের মতো প্রাণঘাতী রোগ সৃষ্টি করতে পারে।


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)এবং আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থা (IARC) পিএম ২.৫ কে ‘জি-১ কার্সিনোজেন ‘ এর তালিকাভুক্ত করেছে। অর্থাৎ এ কণা মানদেহের ক্যান্সার সৃষ্টিতে একদম প্রথম সারিতে অবস্থান করছে. যা বৃদ্ধ এবং বাচ্চাদের জন্য এ কণা আরো বেশি ক্ষতিকর।


ঢাকার পরই নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর সবচেয়ে বেশি দূষণের শিকার৷ প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ মাসে বায়ু দূষণ সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করে৷ ইট ভাটাগুলো বায়ু দূষণের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী৷ বায়ু দুষণের জন্য ইটভাটা ৩৪ ভাগ এবং মোটরযান ১৮ ভাগ দায়ী৷ ঢাকার পাশাপাশি ছোট জেলা শহরগুলোতে বায়ু দূষণ বেড়ে চলেছে।
‘বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি-২০১৭’ নামক এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বায়ু দূষণের কারণে আমাদের দেশে প্রতি বছর প্রায় ১লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী ২০১৫ সালে সাকুল্যে ৪২ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বায়ু দূষণের কারণে।



দূষণ বাড়ছে, যেহেতু জনসংখ্যা বাড়ছে শহরগুলোতে। উন্নয়ন কর্মকান্ড বাড়ছে এবং গাড়ির সংখ্যাও বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ সরকার পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে. ট্যানারি কারখানাগুলো ঢাকা থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। ইটের ভাটায় বিকল্প ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। সরকারি ভাবে এ ধরণের বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে যেন আমাদের পরিবেশে বায়ু দূষণ কমে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের মতে, শুধু সরকারি পদক্ষেপে পরিস্থিতি সামাল দেয়া সম্ভব নয়। পরিবেশ রক্ষায় মানুষের সচেতনতাও প্রয়োজন। যদি আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এখনি সচেতন না হই তবে এর ফলাফল স্বরূপ আমাদের কেই একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভয়াবহ পরিস্থিতির মাঝে পড়তে হবে।



Writer: Lutfun Nahar Mukta (Co-founder and CCO, Meditor Health)

 


Reference and Bibliography:
1. http://www.bbc.com/bengali/39003586
2. http://www.dw.com
3. https://www.jagonews24.com/opinion/news/219262
4. http://www.prothomalo.com/bangladesh/article/1082457